১। আপনার মনে কি কখনো প্রশ্ন জেগেছে আমাদের সম্পূর্ণ দেহ একটা ভ্রুন থেকে সৃষ্টি হলেও প্রতিটি অঙ্গ এত ভিন্ন কেন ?
২।আইডেন্টিকাল টুইনসদের মাঝেও এত পার্থক্য থাকে কেন?
৩। আপনার সাথে আপনার বাবা মায়ের এত পার্থক্য কেন ?
এরকম আরো হাজার হাজার প্রশ্নের উত্তর দিবে এপিজেনেটিক্স ।
তো এই এপিজেনেটিক্স সম্পর্কে জানার আগে চলেন ডিএনএ বাবাজি সম্পর্কে একটু বেসিক জেনে নিই
জীবজগতের বংশগতির ধারক ও বাহক হলো ডিএনএ। জীবকোষের নিউক্লিয়াসে ক্রোমোসোমের মধ্যে এর অবস্থান। ডিএনএ অণুগুলো বেশ বড়ো আকারের হয়। লম্বা দুটো সুতোর মতো পরস্পরকে এরা জড়িয়ে থাকে। আর এই জড়িয়ে থাকা কাঠামোটিকে বিজ্ঞানীরা নাম দিয়েছেন ডিএনএ ডবল হেলিক্স। এই ডবল হেলিক্স কাঠামোটি তৈরী হয়েছে ডি অক্সি রাইবোস, ফসফেট এবং চার ধরণের নাইট্রোজেন বেইস (base) দিয়ে ।ডিএনএর কাজ হলো জীব জগতের জেনেটিক কোডকে ধারণ করা। জেনেটিক কোডের বর্ণমালায় রয়েছে ডিএনএর চারটি নাইট্রোজেন বেইস, অ্যাডেনিন,থায়মিন,গুয়ানিন এবং সাইটোসিন। এদেরকে এদের নামের চারটি আদ্যক্ষর (ATGC) দিয়ে প্রকাশ করা হয়। এই চারটি মাত্র “অক্ষরের” সামগ্রিক বিন্যাসে এককোষী ব্যাকটেরিয়া সহ যাবতীয় উদ্ভিদ ও প্রাণীর জিনোম (একটা অঙ্গের সকল তথ্য যেখানে থাকে) রচিত হয়েছে।

Double helix of DNA
এখন প্রথম প্রশ্নে ফিরে আসি। আমরা অনেকেই ভাবি (বইয়েও থাকে) ডিএনএ মনে হয় টেম্পলেটের মতো ,প্রতিবার বিভাজনে একই রকম থাকে। আসলে তা কিন্তু না । বরং ডিএনএ মুভির স্ক্রিপ্টৈর মতো। একটা উদাহরণ দেই।
১৯৩৬ সালে George Cukor রোমিও জুলিয়েট নামের একটা মুভি তৈরি করে। আবার DiCaprio কিন্তু একই নামে আরেকটি মুভি করে। দুটোই সেক্সপিয়ারের তৈরি এক স্ক্রিপ্ট হলেও মুভি দুটি কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন। আরে বলিউডের রিমেক গুলো দেখলেই তো বুঝে যাওয়ার কথা।
তো আমাদের দেহের এত বিচিত্র গড়নের কারণ অনেকে ডিএনএ এর এই বৈশিষ্ট্যের কথা যে কোষ গুলো একই তথ্য বিভিন্ন ভাবে ব্যবহার করে। সত্যি বলতে কি ব্যাপারটা অনেকটা এরকম যে আমি আপনাকে জিজ্ঞেস করলাম গাড়ি চালায় কি করে? আর উত্তরে বললেন স্টিয়ার ঘুরিয়ে। (Not enough information)
এর সঠিক উত্তর কি ?
––এপিজেনেটিক্স
কিভাবে কাজ করে ?
–সামনে বলছি 😁😁
২য় প্রশ্নে আসি । আচ্ছা তার আগে বলেন schizophrenia রোগ সম্পর্কে ধারণা আছে তো ? শালা মেন্টাল হেলথের বারোটা বাজিয়ে ফেলে। তো সম্প্রতি জানা গেছে এর পিছনে জেনেটিক্স শক্ত ভূমিকা পালন করে। আবার রিপোর্ট এও বলে যে জমজ সন্তানের মধ্যে এক জনের schizophrenia হলে ৫০% চান্স থাকে অপর জনেরও হওয়ার। তো প্রশ্ন হলো ১০০% হয় না কেন ? অনেকে পারিপার্শ্বিকের কথা বললেও সত্যি বলতে এক্ষেত্রে এর তেমন কোন ভূমিকা নেই। তাছাড়া এমনিও তো অনেক পার্থক্য দেখা যায়, তো কেন ? তাদের তো সম্পূর্ণ জিনোম এক এবং প্রায় সব কিছুই তো একসাথে।
উত্তর—ঐ যে এপিজেনেটিক্স ।
৩য় টাই আসি এখন। একটা কেস স্টাডির কথা উল্লেখ করি এখন।
অনেক সময় বিশেষ করে ৩ বছরের ছোট বাচ্চাদের বাবা মা মারপিট করে বা তাদের কাছ থেকে আলাদা করে দেওয়া হয়। তখন স্বাভাবিক ভাবেই রাষ্ট্র বাচ্চাটার দায়িত্ব নেয়। এক্ষেত্রে যে সব বাচ্চারা ভালোও থাকে এবং তাদের ডার্ক পাস্ট সম্পর্কে নাও ধারণা থাকে তবুও তারা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ডিপ্রেশনে থাকে। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য এর পিছনেও কাজ করে এপিজেনেটিক্স।
তো কি এই এপিজেনেটিক্স? তার আগে দুটি ইতিহাস বলি তাহলে বিষয়টা বুঝতে সুবিধা হবে
১৯৪৪ সালের নভেম্বর মাসের ঘটনা।যুদ্ধে বিদ্ধস্ত নেদারল্যান্ড তখনও জার্মানির কবলে। এমন সময় হলো কি খাবার সাপ্লাই বন্ধ করে দিল নাযিরা। মানুষের তখন প্রয়োজনের ৩০% খাবারো জুটেছিল না। ঘাস,কাঠ যা পেয়েছে তাই খেলেও প্রায় ২০ হাজার মানুষ মারা যায়। তো এই ভয়াবহ সময়েও বিজ্ঞানীরা থেমে থাকেননি। তারা খুব ভালো ভাবে, কাছ থেকে নির্যাতিত মানুষদের পর্যবেক্ষণ করে। এতে যে ফলাফল আসলো তা সত্যি অবিশ্বাস্য। তারা নতুন শিশু জন্মগ্রহণের ক্ষেত্রে একটা প্যাটার্ন খুঁজে পেল। দেখা গেল যে সব গর্ভধারিনীরা প্রসবের শেষের কয়েকটা মাস এই দূর্ভিক্ষের মধ্যে কাটিয়েছে তাদের বাচ্চারা স্বাভাবিকের চেয়ে ছোট ও পাতলা হলো। কিন্তু অবিশ্বাস্য ব্যাপার হলো পরবর্তীতে তারা সারা জীবন পর্যাপ্ত খাবার পেলেও তারা ভগ্ন স্বাস্থ্যের অধিকারী হয়েই থাকলো। আরো মজার ব্যাপার হলো তাদের পরবর্তী প্রজন্মেরও একই সমস্যা দেখা গেল।
আবার যে গর্ভধারিনীরা প্রসবের প্রথম দিকে এই বিপর্যয় সাফার করলো তাদের বাচ্চারা স্বাভাবিক হলেও পরবর্তীতে তারা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশী স্থূল শরীরের অধিকারী হলো। আবার মানসিক সমস্যার হারও তাদের মধ্যে অনেক বেশি দেখা গেল।আর এদেরও সেম কাহিনী। পরবর্তী প্রজন্মেও দেখা গেল।

ডাচ হাঙ্গার উইন্টারের সময় তুলা একটি ছবি
আরেকটি কেস স্টাডির কথা উল্লেখ করি।Brian Dias নামের এক গবেষক ইঁদুর নিয়ে গবেষণা করছিলেন। তিনি কিছু ইঁদুরকে এসিটোফোনের সংস্পর্শে আনলেন এবং তাদেরকে মৃদু শক দিলেন। এই কাজ তাঁরা টানা ৩ দিন দৈনিক ৫ বেলা করে করলেন। এর ১০ দিন পর তাদের স্বাভাবিক জননের মাধ্যমে নতুন ইঁদুর নিয়ে আনলেন। দেখা গেল তারা এসিটোফোনের প্রতি খুব সেনসিটিভ হয়ে গেল এবং ওটার সংস্পর্শে আসলে হতবাক হয়ে যেত।আর তাদের বাচ্চারা ? ওরা তো এসিটোফোনকে রীতিমতো ভয় পাওয়া শুরু করলো।
Brian Dias

এখন আসি এই এপিজেনেটিক্স বিষয়টা কি
খুব সহজ ভাবে বললে আমাদের ব্যবহার , পরিবেশ, জীবন যাত্রার কারণে জিনোমের কাজের যে পরিবর্তন হয় সেটাই এপিজেনেটিক্স। এটি ডিএনএ সিকুয়েন্স পরিবর্তন করে না বরং আমাদের দেহ কিভাবে ডিএনএ সিকুয়েন্স পড়ে সেটা পরিবর্তন করে।
অন্যভাবে বললে এটি আমাদের genotype এর পরিবর্তন ছাড়াই phenotype এর পরিবর্তন করে।(নীল চোখ থাকা হলো phenotype আর নিল চোখের জন্য যে জিন গুলো কাজ করে তাদের সমষ্টি হলো genotype )
একটা উদাহরণের মাধ্যমে বুঝতে সুবিধা হবে,
মনে করেন আমাদের জীবনটা হলো একটা সিনেমা। কোষগুলো হলো অভিনেতা, ডিএনএ হলো স্ক্রিপ্ট।ডিএনএ সিকুয়েন্স হলো স্ক্রিপ্টের ডাইলোগ।ডাইলোগ গুলো বলার সময় যে ঘটনা গুলো ঘটবে সেগুলো জিনোম। পুরো জেনেটিক্স বিষয়টা হলো screen writing।আর এপিজেনেটিক্স হবে DIRECTING. যার ওপর সম্পূর্ণ সিনেমা নির্ভর করছে।
এপিজেনেটিক্স কিভাবে কাজ করে তার একটা উদাহরণ দেই। একটা বইয়ের কথা চিন্তা করেন।বইয়ের প্রতিটি শব্দ জেনেটিক কোড।আর আমরা যে অতি গুরুত্বপূর্ণ,কম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে বিভিন্ন কালি দিয়ে দাগায় সেটা এপিজেনেটিক্স।
পরবর্তী পর্বে বিস্তারিত আলোচনা হবে।😁😁
লেখক- Shahriar Alam
shahriaralam763@gmail.com