
বর্তমানে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় গুলোর মধ্যে একটি হল কোয়ান্টাম কম্পিউটিং। কারণ এই কোয়ান্টাম কম্পিউটিং এর হাত ধরেই উন্মোচন হতে পারে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের নানা সমস্যার সমাধান। কোয়ান্টাম সুরঙ্গে সবাইকে স্বাগতম।
উনিশ শতকের আগষ্ট মাস। সেবার এর ইন্টারন্যাশনাল কংগ্রেস অফ ম্যাথমেটিকস আয়োজন করা হয়েছিল প্যারিসে আর সেখানেই ঘটে গেল গণিতের ইতিহাসে সবচেয়ে বিস্ময়কর ঘটনা। জার্মান গণিতবিদ David Hilbert বিংশ শতাব্দীর গণিতের ভবিষ্যত কেমন হবে তার রূপরেখা তুলে ধরতে গিয়ে তেইশটি অমীমাংসিত সমস্যার কথা উল্লেখ করেন। তার মধ্যে দশম সমস্যাটি পৃথিবীর ইতিহাস চিরতরে পালটে দিল। হিলবার্টের দশম সমস্যাটি হল: Find an algorithm to determine whether a given polynomial Diophantine equation with integer coefficients has an integer solution অর্থাৎ একটি ডাইওফ্যান্টাইন সমীকরণের একটি অবিচ্ছেদ্য সমাধান আছে কিনা তা নির্ধারণের জন্য একটি পদ্ধতি (যাকে আমরা এখন একটি অ্যালগরিদম বলে থাকি) সন্ধান করা,যা 1970 সালে ইউরি মাতিয়াসিভিচ সমাধান করেছিলেন।একটু কেমন যেন খটমট লাগছে তাই না, এবার একটা উদাহরণ দেয়া যাক
X২ + y২ – 8 = 0
যা একটি ডায়োফেন্টিন সমীকরণের উদাহরণ। সাধারণভাবে, ডায়োফেন্টিন সমীকরণ হল একটা বহুপদী (বা পলিনোমিয়াল) সমীকরণ যার বিভিন্ন পদের সহগ হল পূর্ণসংখ্যা (ইনটিজার)।
যেমন, উপরের সমীকরণে x২ আর y২ দুটো পদেরই সহগ (কো-এফিশিয়েন্ট) হল 1, যেটি একটি পূর্ণসংখ্যা। হিলবার্ট খোঁজ করছিলেন ডায়োফেন্টিন সমীকরণের পূর্ণসাংখ্যিক সমাধান।
আচ্ছা এ সমীকরণের কি কোন পূর্ণসাংখ্যিক সমাধান আছে? অবশ্যই আছে! X = 2 এবং y = 2
আরেকটি সমীকরণ দেখা যাক
3x^{2}-2xy-y^{2}z-7=0
আচ্ছা এর সমাধান কী হতে পারে? অবশ্যই x = 1, y = 2, z = -2. কিন্তু এই সমীকরণ এর কী কোন সমাধান আছে? X^{2}+y^{2}+1=0.
এটির কিন্তু কোন পূর্ণসাংখ্যিক সমাধান নেই!
উপরের তিনটি সমীকরণের সমাধানের অস্তিত্ত্ব আছে কিনা সেটি বের করা খুব একটা শক্ত নয়। কিন্তু, নীচে একটা ডায়োফেন্টিন সমীকরণ দিলাম। এটার পূর্ণসাংখ্যিক সমাধান বের করুন তো!
3X২ + 2y২ = 2003(x – y).
একটু ঘাবড়ে গেলেন, ব্যাপার নাহ।
ডেভিড হিলবার্ট এমনই একটি যান্ত্রিক পদ্ধতির খোঁজ চেয়েছিলেন যেটি কিনা বলে দিবে কোন সমীকরণের পূর্ণসাংখ্যিক সমাধান আছে কিনা। পরবর্তী সময়ে তার এই ধারণাটি তরুণ গণিতবিদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে এবং আস্তে আস্তে সমস্যাটির আরো সাধারণীকরণ (generalization) হতে থাকে এবং ঊনিশশো আটাশ সালে এসে এটি এন্টশাইডুংসপ্রবলেম (Entscheidungsproblem) বা সিদ্ধান্ত-সমস্যায় রুপ নেয়। সিদ্ধান্ত-সমস্যা ব্যাপারটি কি? এটি একটি গাণিতিক সমস্যা যার উত্তর দেওয়া যায় হ্যাঁ বা না এই সিদ্ধান্ত দিয়ে। সিদ্ধান্ত-সমস্যাটি নিচের মত:
“যদি কিছু স্বত:সিদ্ধ ও একটি গাণিতিক প্রস্তাবনা দেয়া থাকে তাহলে সেই স্বত:সিদ্ধগুলির ভিত্তিতে গাণিতিক প্রস্তাবনার সত্যতা কোনো স্বয়ংক্রিয় যান্ত্র্রিক পদ্ধতিতে জানা সম্ভব।“
• সিদ্ধান্ত সমস্যা নিয়ে কাজ শুরু করেন ম্যাক্স নয়ম্যান, কার্ট গডেল, অ্যালান ট্যুরিঙয়ের মত নামকরা গণিতবিদরা।অ্যালান ট্যুরিঙ ১৯৩৬ সালে একটি গবেষণাপত্রে ট্যুরিঙ যন্ত্র নামে একটি গাণিতিক ধারণা প্রস্তাব করেন। তিনি দেখান যে যে কোনো গাণিতিক প্রক্রিয়াকে যদি ক্রমসূচী বা অ্যালগরিদম হিসেবে লেখা যায় তাহলে সেটি ট্যুরিঙ যন্ত্রে চালিয়ে সেই সংশ্লিষ্ট গাণিতিক সমস্যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সমাধান করা যায়। পরে ১৯৩৮ সালে তার প্রস্তাবে ট্যুরিঙ সেই যন্ত্রের আরো প্রয়োগ দেখান। ধ্রুপদী কম্পিউটারবিজ্ঞানের জন্ম যেসব মৌলিক কাজের হাত ধরে ট্যুরিং যন্ত্র তার মধ্যে অন্যতম। একই সময়ে আরেকজন বিখ্যাত গণিতবিদ আলোঞ্জো চার্চও স্বাধীনভাবে প্রায় একইরকম একটি তত্ত্ব দাঁড় করান। দুজনেরই অবদানকে স্বীকৃতি দেয়া স্বরূপ কাজগুলোকে একত্রে চার্চ-ট্যুরিঙ প্রস্তাব বলা হয়। প্রস্তাবেরটি হল:
“একটি সর্বজনীন কম্পিউটারে বস্তুজগতের যান্ত্রিকভাবে বর্ণীত যেকোন গাণিতিক সমস্যার সমাধান করা সম্ভব।“
এবার প্রশ্ন হল ট্যুরিং যন্ত্র কাজ করে কিভাবে? এই যন্ত্র আসলে আপনার লেখা প্রোগ্রাম বা নির্দেশনা মত কাজ করে। আপনি কিভাবে আর কোথায় এই নির্দেশমালা লিখবেন?
একটি উদাহরণ দেয়া যাক ধরুন আপনি ২ এর সাথে ৩ যোগ করবেন। ট্যুরিং যন্ত্র সেটি কিভাবে করবে? ট্যুরিং যন্ত্র যোগ বিয়োগ বুঝে না। এটি কেবল পারে ০ বা ১ পড়তে, লিখতে বা মুছতে। যার মানে হল আমরা যদিও কম্পিউটার দিয়ে বড় বড় গাণিতিক সমস্যা সমাধান করে থাকি ট্যুরিং যন্ত্র তার কিছুই টের পায় না। সে যোগ, বিয়োগ, গুণ, ভাগ কিছুই পারে না। পারে কেবল পড়তে, লিখতে আর মুছতে। মজার ব্যাপার হল এই তিনটি কাজ ঘুরিয়ে ফিরিয়ে করিয়ে সব বড় বড় গাণিতিক সমস্যা সমাধান করা হয়। এবার আরও একটি উদাহরণ দেই, ধরুন আমাকে জিজ্ঞেস করা হল ২ + ৩ = ? আমার সামনে একটি বাটিতে ২টি আপেল আর অন্য বাটিতে ৩টি আপেল আছে। ধরুন কোন এক রহস্যময় কারণে আমি যোগ করতে পারি না। আমি পারি কেবল আপেল এক বাটি থেকে অন্য বাটিতে সরাতে। যদি একটি একটি করে আপেল প্রথম বাটি থেকে দ্বিতীয় বাটিতে সরাতে থাকি, এক সময় দ্বিতীয় বাটিতে ৫টি আপেল হয়ে যাবে। এটিই ২+৩ এর উত্তর। কম্পিউটারও এরকম ধাপে ধাপে কাজ করে।
• এখন দুই থেকে এক বিয়োগ করবে কি করে? আগে বলেছি ট্যুরিং মেশিন বিয়োগ কি, জানে না। কিন্তু সে প্রত্যেকটি চিহ্নকে তার বিপরীত চিহ্নে পাল্টে দিতে পারে। দ্বিমিক পাটিগণিতে যদি কোন সংখ্যার অংকগুলোকে পাল্টে দেয়া হয় (এককে শূন্যতে আর শূন্যকে একে) তাহলে তা যোগের সময় একটি সীমা পর্যন্ত ঋণাত্মক সমমানের কাজ করে। কাজের ২ এর চিহ্ন পাল্টালে এটি হবে -২। তারপর এর সাথে ১ যোগ করলে হবে -১। তারপর আবার চিহ্ন পাল্টালে হয়ে যাবে ১। এভাবে কম্পিউটারে কোন সংখ্যা থেকে ১ বিয়োগ করা হয়।‘ট্যুরিং যন্ত্র যেহেতু শুধু ০ আর ১ লেখা যায় সুতরাং সব গণিত করতে হয় এই দুটি চিহ্ন ব্যবহার করে। একে জর্জ বুলের নামানুসারে বলা হয় বুলিয়ান বীজগণিত। গণিতের ভাষায় একে বলা হয় দুই চিহ্নের গ্যালোয়া ক্ষেত্র।‘
• আর এভাবেই David Hilbert এর অমিমা্ংসিত প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতে দ্বার উন্মোচন হয় কোয়ান্টাম কম্পিউটিং এর।
Asif Iqbal
Head of Department – Physics
আনন্দিত হলাম নিজের লেখা দেখতে পেয়ে 😊
LikeLiked by 1 person